বুনোফুল গুলো একদিন তাদের জ্ঞান, মেধা ও আলো দিয়ে পুরো সমাজ ও জাতিকে আলোকিত করবে - মৌত্রিময় চাকমা, শিক্ষার্থী, চ.বি II
পাহাড়ের বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—শিক্ষা এখনও সবার জন্য সমানভাবে পৌঁছে যায়নি। যেখানে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অবহেলা এবং উন্নয়ন বৈষম্যের গল্প। শিক্ষা, যা একটি সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার মূল চালিকাশক্তি, তা এখনও পাহাড়ের প্রতিটি শিশুর কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি।
দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের অভাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং নানা সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা এই পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তবুও এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেও পাহাড়ি শিশুদের শেখার প্রতি অদম্য আগ্রহ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের নিষ্পাপ চোখে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন, নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়।
এটা স্পষ্ট যে শিক্ষা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার নয়; এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মপরিচয় বজায় রাখা এবং আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। একটি শিক্ষিত প্রজন্মই পারে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং সমাজকে একটি সঠিক পথে পরিচালিত করতে। তাই পাহাড়ে একটি সচেতন, মানবিক ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন ব্যক্তিদের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান—এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তারই ধারাবাহিকতায় JUM Academy: Free Coaching for Indigenous Students এবং Dhaka University Jumma Students Family-এর যৌথ উদ্যোগ বান্দরবানের আলীকদম সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ক্রংলেং পাড়ায় Free Education Campaign for Indigenous Students-2026 আয়োজন করা হয়, যার অংশ হিসেবে আমাদের সেখানে যাওয়া। সেখানে প্রায় ৭০ পরিবার ম্রো আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস। গ্রামবাসীদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি মাত্র প্রাইমারি স্কুল রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর বেশি হলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শুধুমাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।
আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চাদের পড়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করা। আমরা বিশ্বাস করি, এমন ক্ষুদ্র কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপগুলো একদিন বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করবে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে থাকা সেই সম্ভাবনাময় “বুনোফুলগুলো” একদিন তাদের জ্ঞান, মেধা ও আলো দিয়ে শুধু নিজেদের জীবনই নয়, পুরো সমাজকেও আলোকিত করবে। তারা হবে আগামীর পথপ্রদর্শক, যারা উন্নয়ন, সমতা ও ন্যায়বিচারের বার্তা বহন করবে। এই যাত্রা নিঃসন্দেহে সহজ নয়।
সামনে থাকবে নানা বাধা, চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিকূলতা। কিন্তু দৃঢ় আশা, পারস্পরিক একতা, সহমর্মিতা এবং নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। যদি আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসি, তবে একদিন পাহাড়ও শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে—এটাই আমাদের বিশ্বাস, এটাই আমাদের স্বপ্ন।
লেখা: মৌত্রিময় চাকমা, শিক্ষার্থী, চ.বি


কোন মন্তব্য নেই:
Jhu Jhu
Welcome to my blog. I know how much my blog will help you. Can not help as you like? Let me know your choice in the comments to get your choice. I will try to give your favorite poems and books. Thank you for coming to my blog, come back .