চাকমা বিয়ে
শুভ্র জ্যোতি চাকমা
বিয়ে শব্দটির চাকমা প্রতিশব্দ ‘মেলা’। আবার বাংলায় মেলা বলতে নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ে উৎসবমূখর পরিবেশে নানা ধরনের পসরা সাজানো দোকানপাট, খেলাধূলা, নাচ-গান, নাগরদোলা, লটারি, যাদু প্রদর্শন, খাবারের দোকান, যাত্রাপালাসহ আরও নানা ধরনের বিনোদন বা আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মেলায় জনসমাগম হয়ে থাকে। অর্থাৎ মেলা আনন্দ ও বিনোদনের একটি বড় মাধ্যম। এটি মানুষের মধ্যে মিলন ও সৌহার্দ্য আনয়নে সহায়তা করে। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, চাকমা ‘মেলা’ এবং বাংলা ‘মেলা’ শব্দটি শুনতে বা উচ্চারণে একই হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, উদ্দেশ্য ও আঙ্গিকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানও একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান। মানবজীবনে এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি এমনই একটি সামাজিক অবিচ্ছেদ্য অনুষ্ঠান যেটির মাধ্যমে দু’জন যুবক-যুবতীকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আর বিয়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সূচিত হয় একটি পরিবারের ভিত্তি। আনন্দের দিক বিবেচনায় ‘মেলা’ শব্দটি চাকমা ও বাংলায় অনেকাংশে সমার্থক। তবে আনুষ্ঠানিকতা ও আয়োজনের দিক দিয়ে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। চাকমা মেলায় সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা যেমনি রয়েছে তেমনি রয়েছে অনেকগুলো জাতিগত রীতি-নীতি যে রীতি-নীতিগুলো তাদেরকে অন্য একটি জাতি থেকে পৃথক করে। পৃথক অর্থে এই-রীতি-নীতির মধ্য দিয়ে তাদের পরিচিতি সহজে বোঝা যায়। এক কথায় মেলায় তাদের জাতীয় সংস্কৃতির একটি বড় অংশ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। আমরা জানি, সংস্কৃতির বাইরে গেলে সেটিকে জাতীয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য বলা যায় না। আবার একটি জাতির সংস্কৃতি যুগে যুগে সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বা থাকতে হবে তা কিন্তু নয়। সীমাবদ্ধ রাখাও যায় না। অবস্থাভেদে সংস্কৃতি তার রূপ বদলায়। এই বদলানো অনেকটা নীরবে হয়ে থাকে। অনুভব করছি, বুঝতে পারছি কিন্তু চোখের সামনে এর পরিবর্তিত রূপ আমরা অবলোকন করছি। আজ, কাল হতে হতে একসময় দেখা গেল অনেকখানি পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই রূপ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যরূপ ধারণ করে। পুরোপুরি লুপ্ত হয় না। এটিও আমাদের জানা আছে যে, কোনো কোনো সংস্কৃতি একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়। আসলে জাতীয় জীবনকে ঘিরে বিশেষত: উৎপাদন ব্যবস্থা, দেশ-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ভৌগলিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করত: সংস্কৃতির রূপ বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের জাতীয় জীবন থেকে লুপ্ত হয়ে যায় অনেক রীতি-নীতি এবং অর্থবোধক শব্দ।
সংস্কৃতির এই রূপান্তর বা পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যখন আমরা হাঁটছি তখন আমার নজরে আসে আমাদের চাকমা বিয়ে বা মেলার সংস্কৃতির দিকে। বর্তমানে চাকমা বিয়ের রীতি-নীতিতে যে সকল নতুন নতুন অনুষঙ্গ আমরা হামেশা লক্ষ্য করছি যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ঘুর্ণায়মান চক্রে পতিত হয়ে আমরা অনেকটা দিশাহীন। এখানে সুস্পষ্টভাবে না আছে ঐতিহ্য না আছে আধুনিকতা। চলমান অনুষঙ্গে আনন্দের প্রাধান্যতাই বেশি লক্ষণীয়, সুনির্দিষ্ট রীতির প্রাধান্যতা নেই। প্রতিনিয়ত নানা অনুষঙ্গ চাকমা বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ হচ্ছে। এই যোগ হওয়াটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং আধুনিক, অনেকের কাছে নয়। সময়ের সাথে তালে তাল মেলাতে গিয়ে নতুনত্ব আসবে। তবে ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার সমন্বয় রেখে রুচিবোধের সাথে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে নতুনত্ব আনতে হবে। কারণ মানুষের রুচিবোধ, শিল্পবোধ এবং চাহিদা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়। হ্যাঁ, অবশ্যই বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দের আধিক্য বেশি থাকবে। কারণ বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই তো আনন্দ। আনন্দ না থাকলে কি বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ? তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনে এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন রীতির প্রচলন আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। দীর্ঘসময় ধরে চাকমাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা একই নিয়মে সম্পাদন করা হতো। কিন্তু যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে, আমরা যতই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি ততই নানা ধরনের নিয়ম, রীতির প্রচলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে-চাকমা বিয়েতে কী কী রীতি রয়েছে ? বিয়ের অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয় ও প্রতিপালনীয় রীতিগুলো কী কী ? জাতিগত সংস্কৃতির বিবেচনায় একই জাতির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রীতি বা নিয়ম তো থাকার কথা নয়! আসলে চাকমা বিয়ের কাজ সম্পাদনের মূল বা মৌলিক রীতি কোনটি ? একটু পেছনে গিয়ে আলাচনা করা যাক। তবে চাকমাবিয়ের প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত আলোচনার পরিবর্তে কিছু মৌলিক দিক আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিমলানন্দ ভিক্ষু তাঁর ‘চুগুলাং সংস্কার’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘চাকমা সমাজের ধারণা ‘‘চুগুলাং’’ নামে এক বিবাহ দেবতা আছেন। তিনি তুষ্ট হইলে বিবাহিত জীবন সুখের হয়, রুষ্ট হইলে পদে পদে বাধা বিপত্তি ঘটিয়া থাকে। ‘‘চুগুলাং’’ অর্থে তাঁহার পূজা করা বা তাঁহার পূজা করিয়া পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়া। আসামি ভাষায় ইহাকে ‘‘চকলাং’’ বলে। ইহার অর্থ বিবাহ। বরুয়ারা বলে ‘‘চুগলাং’’। শুভ লং(শুভ লগ্ন) হইতেই ‘‘চকলাং’’, ‘‘চুগলাং বা চুগুলাং’’ শব্দের উৎপত্তি। হিন্দু সমাজের লক্ষ্মী ও স্বরস্বতী, মহাযান বৌদ্ধ সমাজের মহাকাল ও মঞ্জুশ্রী প্রভৃতি দেব-দেবীগণের মত ‘‘চুগুলাং’’ পরিকল্পিত হইয়া চাকমা সমাজে স্মরণাতীতকাল হইতে দেবতারূপে পূজিত হইতেছে।’’(গৈরিকা, ১১বর্ষ, ১২শ সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৩৫৯ বাংলা) বিগত ১৯৭৬ কি ৭৭ সালের ঘটনা। আমার মেঝো পিসির বিয়ের অনুষ্ঠানে(কুজুমছড়ি, বরকল) চুঙুলং পূজা সম্পাদনের ঘটনা এখনো আমার চোখে ভাসে। অনেকে এই পূজার বানান ‘চুঙলং’, ‘চুঙুলাং’, ‘চুগুলাং’ও লিখে থাকেন। চুঙুলং-কে চাকমারা গৃহদেবতা হিসেবে মান্য করেন। তৎপূর্বে স্ব-চক্ষে আমি চুঙুলং পূজা অবলোকন করেছিলাম তা মনে নেই। হয়তো ছোট ছিলাম বলে মনে রাখতে পারিনি। দেখেছিলাম, ওঝা পূজার বেদীস্থলে শূকরের মাথা, জবাই করা আস্ত মোরগ রেখে চুঙুলং পূজা সম্পাদন করে দিচ্ছিলেন। বেদীর মণ্ডপে বিশেষভাবে কর্তনকৃত বাঁশের কাইমে জবাইকৃত পশু বা পক্ষীর রক্ত লাগানো। ওঝা মন্ত্র পড়া শেষ করলে বর-কনেকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে হলো। ওঝার মতে, দেবতারা তুষ্ট হলে পূজার কার্য সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ চুঙুলং পূজাটি কিছু দেবতার উদ্দেশ্যে প্রাণী বলী দিয়ে সম্পন্ন করতে হয় যা চাকমা বিয়ের অবিচ্ছেদ্য রীতি। চাকমাদের বিশ্বাস যে, চুঙুলং দেবতা অসন্তুষ্ট হলে অমঙ্গল হয়ে থাকে। পারিবারিক সুখ-শান্তি অধরা থাকে। এই কারণে চুঙুলং পূজা খুবই স্পর্শকাতর বলে চাকমারা বিশ্বাস করেন। চুঙুলং পূজা ব্যতীত চাকমাদের অধিকাংশ পূজার কার্য সম্পাদনেও প্রাণী বলী দিতে হয়। অর্থাৎ চাকমারা যে সকল অদৃশ্য দেবতার পূজা-অর্চনা করেন সেসকল দেবতারা প্রাণী উৎসর্গ পেলে তুষ্ট হন। এছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে মদ উৎসর্গ করতে হয়। একমাত্র সিন্দি পূজা ব্যতীত চাকমাদের সকল পূজায় মদ প্রয়োজন। এমনকি মা-লক্ষ্মীকে ভাত অর্পন করতেও মদ লাগে। দেবী হলেও তিনি মদ্যপানে অভ্যস্ত। প্রসঙ্গত যে, হিন্দুদের লক্ষ্মীদেবীর সাথে চাকমাদের মালক্ষ্মীমা দেবীর পার্থক্য রয়েছে। চাকমা মালক্ষ্মীর কোনো ছবি নেই যা হিন্দুদের রয়েছে। যেখানে চাল রাখা হয় সেই জায়গার সম্মুখে কলাপাতায় করে চাকমারা মালক্ষ্মীকে ভাত অর্পন দিয়ে অর্চনা করেন। এছাড়া অনেক দেবতা আছে যাদেরকে চাহিদাভেদে শূকর, ছাগল, মোরক-মুরগি বলী দিয়ে তুষ্ট রাখতে হয়। এই ধরনের বিশ্বাস চাকমাদের মধ্যে কখন থেকে প্রবেশ করেছে তা আমাদের জানা নেই। আমরা দেখতে পাই যে, এই ভারতীয় মহাদেশের অধিকাংশ পাহাড় ও বন নির্ভর জাতিগোষ্ঠীগুলো মধ্যে অদৃশ্য দেবতাদের পূজা-অর্চনা করার রীতি প্রচলন রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মালবম্বী হয়েও জীব বলীদানের প্রথা পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে চাকমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে বলে ধারনা করা যায়। তবে চুঙুলং পূজা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে চাকমাদের একটি কাহিনী রয়েছে। কাহিনীটি এইরকম-রাজা বিজগ্রীর(বিজয়গিরি) সাথে চারজন পণ্ডিত, সাতসমু সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে প্রধান সেনাপতি রাধামন গৃহদেবতা ‘চুঙুলং-এর উদ্দেশ্যে মানত করেছিলেন যে, যদি তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করে নিরাপদে বাড়িতে ফিরতে পারেন তাহলে স্ত্রী ধনপুদিকে নিয়ে ধল(সাদা) গরু দান করে চুঙুলং পূজা করবেন। এই কাহিনী থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমাদের চুঙুলং পূজাটি অতি প্রাচীন। কালে কালে এটি বিবাহ কার্য সিদ্ধিতে যুক্ত হয়ে যায়।
সুদীর্ঘকাল ধরে চাকমারা বিশ্বাস করে আসছেন যে, চুঙুলং পূজা সম্পাদন না করলে বিয়ে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কাজেই এই পূজাটি আবশ্যিকভাবে সম্পাদন করতে হয়। বোঝা গেল, চুঙুলং পূজা হচ্ছে চাকমা বিয়ের অত্যাশ্যকীয় অংশ। এছাড়া উপস্থিত লোকজনদের স্বাক্ষী রেখে বর-কনেকে একটি কাপড়ে বেঁধে ‘জোড়া বানিদেনা’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হয়। এটি সামাজিক স্বীকৃতি। চাকমা সমাজে বিয়ে সম্পাদনের আনুষ্ঠানিকতার প্রধান শর্ত হলো-সামাজিক স্বীকৃতি। লিখিত কোনো সনদ দেয়া হয় না। তবে আজকাল, কোনো কোনো এলাকায় বিয়েসনদ দিতে দেখা যায় এবং ওঝার স্থলে সাধারণ মানুষের মাধ্যমে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে দেখা যায়। এই নিয়মগুলো প্রয়োজনীয়তার তাগিয়ে অনেকে সৃষ্টি করেছেন। তবে এখনো সার্বজনীনতা পায়নি। একজন সাধারণ মানুষের মাধ্যমে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার ঘটনা আমি প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিলাম ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলার সার্বোতলী গ্রামে। ত্রিপিটকের নির্বাচিত কিছু অতি ক্ষুদ্র অংশ পাঠের মাধ্যমে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয় যেটি চুঙুলং পূজার পরিবর্তে করা হয়। অনেকের মতে, ত্রিপিটকের কোনোখানে বিয়ে পরানোর সূত্র নেই। যারা এই পদ্ধতিতে বিয়ের মূল কার্য সম্পাদন করছেন তারা অনেকটা ধর্মান্ধ হয়ে করছেন। কারণ মূল চুঙুলং পূজায় প্রাণী বলী দিতে হয়। এখানেও প্রশ্ন থাকে। সেটি হলো-নিমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যয়নের জন্যতো প্রাণী জবাই করা হয়ে থাকে। পাপকর্মতো এখানেই সংঘটিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে চাকমা বিয়ের মূলকার্য সম্পাদনে জোগাখিঁচুড়ি অবস্থা বিরাজ করছে। আমার মতো অনেকেই দু’ধরনের বিয়ের কার্য সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা হামেশা দেখে চলেছেন। আবার কোনো কোনো এলাকায় ধর্মীয় পুরোহিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ করে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করার মাধ্যমে বিয়ের কার্য সম্পাদন করার প্রবণতাও দেখা যায়। মঙ্গলসূত্র শ্রবণ মানসিক প্রশান্তির অন্যতম একটি উপায়। পারিবারিক সুখ-শান্তি, আপদ-বিপদ, রোগবালাই থেকে মুক্তি এবং অশুচিত্ব দূরীকরণে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করে চাকমারা মানসিক তৃপ্তি অনুভব করেন। এই সূত্র শ্রবণের মাধ্যমে বিয়ের কার্যসিদ্ধি হয় না। এর সাথে বিয়ের কার্য সম্পাদনের যোগসূত্র থাকার কথা নয়। প্রকৃত অর্থে এই কার্যটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে পড়ে না। পূর্বে নতুন বউ ঘরে তোলার পরদিন চুঙুলং ওঝার মাধ্যমে চাকমারা ‘বুরপারা’ বা ‘মাধাধনা’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতেন। এই অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে-অশুচিত্ব দূরীকরণ অর্থাৎ এক ধরনের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান যার দ্বারা আপদ-বিপদ দূরীভুত হয় বলে চাকমারা বিশ্বাস করেন।
চাকমারা সাধারণত পারিবারিক মঙ্গল কামনার্থে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করেন। এতে চাকমা বিয়ের অপরিহার্য ‘চুঙুলং পূজা’ উপক্ষিত হয়ে থাকে। সমস্যা হলো-আমরা প্রতিনিয়ত ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে তালগোল পাকিয়ে ফেলছি সেটি বুঝে হোক বা না বুঝে হোক। দু’টো বিষয়কে এককাতারে গুলিয়ে ফেলছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, সংস্কৃতির অনেক উপাদান বা অনুষঙ্গ ধর্মের সাথে যায় না। ধর্ম ও সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেললে কোনোটিরও মৌলিকত্ব থাকে না। যেমন-কোনো কোনো ওঝা প্রাণী বলী না দিয়ে শুধুমাত্র ফুল দিয়ে চুঙুলং পূজা সম্পন্ন করে দিয়ে থাকেন। এতে চুঙুলং পূজার মাহাত্ম থাকে না। কারণ চুঙুলং পূজায় পূজিত দেবতারা প্রাণী ব্যতীত তুষ্ট হন না। সাথে মদ অপরিহার্য। কাজেই ফুল দিয়ে চুঙুলং পূজা সম্পাদন প্রক্রিয়াটি অনেকটা পোলাও বিরিয়ানি খেতে অভ্যস্ত লোককে সিদোল তরকারি দিয়ে আপ্যয়ন করার মতো। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে চাকমা বিয়ের কার্য সম্পাদন করা হচ্ছে যাতে চাকমা বিয়ে অনুষ্ঠানের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা হয় না। এতেও যে চুঙুলং পূজার দেবতারা অখুশি হয়ে ক্ষতিসাধন করছে তা কিন্তু নয়। মোদ্দা কথা হল-সবকিছুই বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংস্কার ও কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করে। তবে আমরা যে বিশ্বাসের ওপর বিয়ের কার্যাদি সম্পন্ন করি তাতে সুনির্দিষ্ট রীতি ও পদ্ধতি থাকা আবশ্যক যা চাকমা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা হতো। এমতাবস্থায়, স্মরণাতীতকাল থেকে চুঙুলং পূজা কীভাবে সম্পাদিত হয়ে আসছে সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেয়া যেতে পারে।
চুঙুলং পূজায় সাধারণত মা-লক্ষ্মী, কালাইয়া, পরমেশ্বরী, রাক্ষল্যা বা নেইনাঙ্যা প্রভৃতি দেবতাকে পূজা দেয়া হয়। এই পূজা সম্পাদনের জন্য কনেকে কুত্তি(চাকমাদের পানি পানের জন্য ব্যবহৃত মাটির তৈরি পাত্র বিশেষ) দিয়ে ঘাট থেকে পানি আনতে হয়। বিভিন্ন বইয়ে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওঝা ৫/৭ জোড়া বাঁশের বেত দিয়ে একটি চাবারা(ছোট মাদুর সদৃশ) বুনন করে তার ওপরে কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপরে পাঁচ পোয়া চাল, পাঁচ পোয়া ধান রেখে দিয়ে উভয়ের মাঝখানে পানিভর্তি কুত্তিটি রাখা হয়। লক্ষ্মীদেবীর উদ্দেশ্যে একটি মুরগি জবাই করার জন্য চালের সম্মুখে বিশেষভাবে তৈরি সাতটি বাঁশের চিলতে একটি চাকটির ওপর বসিয়ে দেয়া হয়। অপর একট চাকটির ওপর ডিমও রাখা হয়। এছাড়া কালাইয়া দেবতাকে পূজার জন্য নৌকা সদৃশ বিশেষভাবে তৈরি একটি চিলতে পুঁতা হয়। পূজায় লক্ষ্মীদেবী ও পরমেশ্বরী উদ্দেশ্যে ২টি মুরগি, কালাইয়া ও রাক্ষল্যা দেবতার উদ্দেশ্যে ২টি মোরগ ও ১টি মর্দা শূকর বলী দেয়া হয়। জবাইকৃত শূকরের মাথাটি পূজাস্থলে রেখে দেবতাদের পূজা দিতে হয়। এরপর জবাইকৃত মোরগ-মুরগিগুলোর নাড়ি-ভুড়ি বের করে আস্তভাবে সিদ্ধ করে পূজা মণ্ডপে এনে পূজার কার্য সম্পাদন করা হয়। একই সময়ে ডিমগুলোও সিদ্ধ করে আনা হয়। ওঝাসহ উপস্থিত অভিজ্ঞজনেরা সিদ্ধডিম, মোরগ-মুরগিগুলোর জিহ্বা, পা(নকসহ) বিশেষভাবে ছিঁড়ে এনে পরীক্ষা করেন এবং নব-দম্পতির সম্ভাব্য শুভ-অশুভ বলে দেন। ওঝা এবং অভিজ্ঞজনদের বলা কথাগুলো নবদম্পতির জীবনে সত্য হিসেবে ঘটে যায় বলে চাকমারা বিশ্বাস করেন। কোনো কোনো ওঝা নব দম্পতির প্রথম সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে হবে তাও বলে দেন। পূজা সম্পাদন শেষে পূজার ধান ও চালগুলো পুনরায় মেপে দেখা হয়। এতে ধান ও চালগুলো বৃদ্ধি পেলে নবদম্পতির দাম্পত্যজীবন উন্নতি এবং কমে গেলে অবনতি হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। উল্লেখ্য যে, চুঙুলং পূজা সম্পাদনের জন্য ওঝা তার নিয়ম অনুযায়ী পূজার বেদী প্রস্তুত করেন। এই পূজা সাধারণত বরের বাড়ির একটি কক্ষে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
শিক্ষিত চাকমাদের অনেককে বলতে শোনা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত চুঙুলং পূজায় শূকরের মাথাকে সালাম করতে হয়। এই কারণে পুরনো রীতিকে অনেকে বর্জন করেন। আসলে সালাম জানানো হয় দেবতাদের। সম্মুখে শূকরের মাথা রাখা হয় বলে এটিতে আদিমত্বার রূপ পরিলক্ষিত হয়। অপরদিকে শুভকাজে প্রাণী বলী দেয়াকে অনেকে ধর্মীয় রীতির পরিপন্থি হিসেবে বিবেচনা করত: ফুল দিয়ে চুঙুলং পূজা সম্পন্ন করে থাকেন। মূল বিষয় হচ্ছে-চাকমাদের পূজিত দেব-দেবীরা পশু-পাখি ভোগ পেলে তুষ্ট হন। একইসাথে নিজস্বভাবে উৎপাদিত মদেরও প্রয়োজন। ধর্মীয় দিক বিচারে প্রাণী হত্যা এবং মদ ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় নয়। ফলে চাকমা সমাজে বিয়ে সম্পাদনের মূল ‘চুঙুলং পূজা’ সম্পন্ন করাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ মত-পদ সৃষ্টি হচ্ছে। এই সৃষ্টি হওয়ার মধ্য দিয়ে চাকমা বিয়েতে নানা নিয়ম এলাকাভেদে সৃষ্টি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। অথচ জাতি হিসেবে একটি রীতি বা নিয়ম মেনে চুঙুলং পূজা সম্পন্ন হওয়ার কথা। স্বীকার করে নিতে হবে যে, চাকমা সমাজ আজও পরিবর্তনশীল বলে বিয়ের কাজ সম্পাদনেও সুনির্দিষ্ট রীতি চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। এর ফলে বিয়ের রূপ, রীতি-নীতি, বিয়ের নৈতিকতা, পোশাক-পরিচ্ছদে সর্বদা পরিবর্তন হচ্ছে। তবে ঐতিহ্যগত রীতি-নীতিতে যেমনি পরিবর্তন হচ্ছে তেমনি কোনো কোনো পরিবর্তন জাতিগত সংস্কৃতিতে নতুন রূপ সংযুক্ত করত: বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাকে রূপময়, আনন্দময় করা হচ্ছে। এই কারণে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন করতে বড় অংকের বাজেট নিয়ে নামতে হচ্ছে। আমরা দেখেছি, বিগত শতকের শেষ সময় পর্যন্ত চাকমা নববধূদের অনেকটা বাঙালিয়ানার সাজে সাজানো হতো। কনেকে শাড়ি পরিয়ে বরের বাড়িতে নিয়ে আসা হতো। বর্তমান সময়ে চাকমা রমণীরা নিজস্ব পোশাক পিনন-খাদি এবং ঐতিহ্যবাহী অলংকার পরিধান করে কনে সাজতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই ধরনের পরিবর্তন অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু নতুনত্বের নামে চাকমাদের ঐতিহ্য, প্রথা, রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির রূপ পরিবর্তন বা বর্জন করে ভিনজাতীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে নয়।
বর্তমানে চাকমা বিয়েতে আরও কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন-চাকমা সামাজিক রীতি অনুযায়ী বর ‘বউ খজা যানা’ দলের সাথে কনের বাড়িতে যায় না। কিন্তু ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরামে কনের বাড়িতে গিয়ে বরকে কনেকে নিয়ে আসতে যায়। কারণ ‘বউ খজা যানা’ দলে বরের কোনো ভূমিকা থাকে না। ‘জোড়া বানি দেনা’ এবং চুঙুলং পূজা সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বামী-স্ত্রীও নয়। পরোক্ষভাবে এই রীতি বা নিয়ম ‘জামেই উধানা’ পর্যায়ে পড়ে। অসচ্ছল বা সামর্থহীনরা সাধারণত কনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের কার্য সম্পাদন করে থাকে। চাকমা সমাজে ‘জামেই উধানা’কে হীনভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তিনপুরের(বিয়ের চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ) সময় হবু বরকে পাত্রীর বাড়িতে যেতে দেখা যায় যা পূর্বে ছিল না। অধিকন্তু শহরাঞ্চলে বর-কনের পিতামাতাকে একেঅপরের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। চাকমা ঐতিহ্যবাহী রীতির পরিপন্থি না হলেও চাকমা সমাজে এই ধরনের ঘটনা পূর্বে ছিল না। ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২-১৪ নভেম্বর তিনব্যাপী আন্তর্জাতিক চাকমা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে ত্রিপুরা রাজ্যে চাকমা সামাজিক আইন প্রসঙ্গতি বেশ আলোচিত হয়েছিল। একটি সেশনে সভাপতিত্ব করার সুবাধে আমি আমার বক্তব্যে পরোক্ষভাবে বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য তুলে। যেমন-ভারতে চাকমা বিয়েতে বর কনের বাড়িতে যায়। বিবাহিত চিহ্ন স্বরূপ কনের হাতে সাদা খাড়ু পরানো হয়। উল্লিখিত দু’টো বিষয় বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হয় না। মতামত দিয়েছিলাম যে, প্রস্তাবিত চাকমা সামাজিক আইনটি সকল এলাকার চাকমার জন্য প্রযোজ্য হবে না।
বিয়ের আনন্দে আমরা এতই মাতোয়ারা যে আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, প্রথাকে অবচেতন মনে পরিবর্তন করে ফেলছি এবং ভিন জাতীয় সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে চিন্তা-ভাবনা না করে গলদকরণ করছি। সংস্কৃতির উপাদানসমূহ রূপান্তর হবে, পরিবর্তন হবে এটিই নিয়ম। তবে এই পরিবর্তন জাতিগত ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করে নয়। রূপান্তরের মাত্রা কতটুকু হবে সেটি আমাদের বুঝতে হবে যাতে আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যগত দিক নিশ্চিহ্ন হয়ে না যায় বা অস্তিত্ব বিলীন হয়ে না যায়। চাকমা জাতীয় বিয়ের সংস্কৃতি কীভাবে এত বিক্ষিপ্তায়ন ধারণ করলো এই বিষয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবা উচিত। বিক্ষিপ্তায়নের ফলে চাকমা জাতীয় সংস্কৃতি একসময় কখন যে পুরো বদলে যায় তা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারব না।
সংগ্রহ: শুভ্র জ্যোতি চাকমা ফেসবুক থেকে ।

0 Comments
Jhu Jhu
Welcome to my blog. I know how much my blog will help you. Can not help as you like? Let me know your choice in the comments to get your choice. I will try to give your favorite poems and books. Thank you for coming to my blog, come back .