চাঙমা বর্ণমালা: আত্মবিস্মৃত জাতির নিরব আত্মসমর্পণ
চাঙমা বর্ণমালা নিয়ে আজ যে প্রশ্ন—“এ থেকে লাভ কী?”—এটি আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক জাতির নিজের শিকড়কে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করার মানসিকতা। যে জাতি নিজের লিপিকেই “অপ্রয়োজনীয়” ভাবতে শেখে, তাকে আর বাইরে থেকে ধ্বংস করার প্রয়োজন পড়ে না—সে নিজেই নিজের ইতিহাস মুছে ফেলে।
বাস্তবতা আরও নির্মম। চাঙমা সমাজের বিপুল অংশ আজ নিজেদের বর্ণমালা চিনে না। এটিই কোনো সাধারণ অজ্ঞতা নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক পতনের দলিল। আর যাঁদের আমরা ‘সচেতন’ বলি, তাঁদের বড় অংশই এই বিচ্ছিন্নতার বাইরে নন। প্রশ্ন তাই তীক্ষ্ণভাবে ফিরে আসে—যে নিজের বর্ণমালাই পড়তে জানে না, সে কোন অর্থে সচেতন?
একসময় এই জাতির জীবন ছিল নিজস্ব লিপিতে বোনা। কবিতা, বারমাস, পালাগান, এমনকি দৈনন্দিন হিসাব—সবই লেখা হতো নিজেদের বর্ণমালায়। ভাষা ছিল জীবনের শ্বাস, আর লিপি ছিল তার দৃশ্যমান শরীর। কিন্তু সেই শরীরকে আমরা ধীরে ধীরে অস্বীকার করেছি। চাঙমা রাজবাড়ি-এর ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে শুরু হয়ে, গৌরিকা-এর মতো বাংলা-নির্ভর প্রকাশনার বিস্তারে যে প্রবণতা গড়ে ওঠে, তা একসময় সাংস্কৃতিক দাসত্বের রূপ নেয়। বাংলা শেখা দোষ নয়—কিন্তু নিজের বর্ণমালাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য ভাষার ছায়ায় আত্মপরিচয় খোঁজা নিঃসন্দেহে পরাজয়ের নামান্তর।
আজ প্রযুক্তির যুগে চাঙমা বর্ণমালা লেখা সবচেয়ে সহজ। ডিজিটাল ফন্ট, মোবাইল, কম্পিউটার—সবই হাতের মুঠোয়। তবুও আমরা লিখি না। কারণ সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়, মানসিকতার। যে মানসিকতা নিজের লিপিকে গুরুত্বহীন মনে করে, তাকে কোনো প্রযুক্তি উদ্ধার করতে পারে না।
এখানে দায় চাপিয়ে দেওয়ার খেলা দীর্ঘদিন ধরে চলছে—রাষ্ট্রের দিকে, সমাজের দিকে, নীতিনির্ধারকদের দিকে। রাষ্ট্রের অবহেলা সত্য, সামাজিক উদাসীনতাও সত্য। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—আমরা নিজেরাই এই পরাজয়কে স্বাভাবিক করে নিয়েছি। নিজেরাই নিজেদের ভাষাকে “ঐচ্ছিক সংস্কৃতি” বানিয়ে ফেলেছি। এই আত্মসমর্পণের চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু নেই।
জাতপ্রেম, দেশপ্রেম যদি কেবল বক্তৃতা, দিবস আর স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনা। নিজের বর্ণমালাকে প্রতিদিনের জীবনে ফিরিয়ে না আনা মানে—নিজের ইতিহাসকে চুপচাপ কবর দেওয়া।
আজ প্রশ্ন তাই আর নিরীহ নয়। প্রশ্ন এখন সরাসরি আঘাত করে—আমরা কি নিজেরাই নিজের বর্ণমালার কফিন বহন করছি না? কারণ সত্য হলো, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে বাইরে থেকে আক্রমণ প্রয়োজন হয় না, যদি সেই জাতি নিজেই নিজের ভাষাকে অব্যবহৃত করে তোলে।
চাঙমা বর্ণমালা আজ আমাদের সামনে কেবল একটি লিপি নয়—এটি একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষা উত্তীর্ণ না হলে, আমরা ধীরে ধীরে শুধু ভাষাহীনই নই, ইতিহাসহীন এক নামমাত্র পরিচয়ে পরিণত হব।

0 Comments
Jhu Jhu
Welcome to my blog. I know how much my blog will help you. Can not help as you like? Let me know your choice in the comments to get your choice. I will try to give your favorite poems and books. Thank you for coming to my blog, come back .