রিপ্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনার একটি স্বতন্ত্র রাজনীতি আছে । কারক ও অবজেক্ট- এর মধ্যকার সম্পর্ক, ধরণ ও কাঠামো সেখানে অনুষটকের কাজ করে । ফলে, অবজেক্ট কখনো অবজেক্টিভলি রিপ্রেজেন্টেড হয়না । এটাই ‘উপস্থাপনার রাজনীতির’ প্রথম পাঠ । কোন বিষয় যখন অন্যের দ্বারা উপস্থাপিত হয়, তখন সেখানে এক ধরনের রাজনীতি থাকে । আবার নিজের বিষয় যখন ‘নিজ’ দ্বারা উপস্থাপিত হয়, তখন সেখানে আরেক ধরণের রাজনীতি থাকে । উভয় ধরনের উপস্থাপনার রাজনীতিই প্রকৃতার্থে ‘অবজেক্ট’কে অবজেক্টিভলি রিপ্রেজেন্টেড হতে দেয়না । এ-তত্ত্বের ফ্রেমওয়ার্ক বর্তমান প্রবন্ধে ‘পাহাড়’ ও ‘পাহাড়ি’ নিয়ে উপস্থাপনার রাজনীতির একটি নজির এখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ।
’পাহাড়’ ও ‘পাহাড়ি’ আমাদের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক পাঠায়তনে নানাভাভে উপস্থাপিত হয় । এতদঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিবর্তিত জাতীয়তাবাদের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি তৈরি করেছে নানান রাজনৈতিক-ডিসকোর্স । যার ভেতর দিয়ে নানাভাবে ‘পাহাড়’ ও ’পাহাড়ি’ উপন্থাপিত হয় । মিডিয়ার মগজহীন বেপরোয়া-চর্চা, বাঙালি স্বাজাত্যবোধ-নির্ভর একাডেমিক অনুশীলন এবং পাহাড়িদের প্রতি বৈরী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এ পার্সপেক্টিভ তৈরিতে কারযকর অনুঘটকের কাজ করছে । সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ’নিউজ-আইটেম’ দিয়ে বিষয়টির সবিস্তার বিশ্লেষণ এখানে পেশ করা হলো ।
’প্রেম যেখানে অপবিত্র’ শিরোনামে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে একটি উপ-সম্পাদকীয় ছাপা হয়। ‘মানুষের জীবনে প্রেম দেশ, কাল, জাতি, বর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে সুন্দর এবং পবিত্র’ - এরকম প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকান্ডের বিপ্রতীপে ‘প্রেমের সাথে অপবিত্রতা’র তকমা দেয়া লেখাটি মনোযোগ আকর্ষণ-যোগ্য নিঃসন্দেহে । কিন্তু মনোযোগ-সহযোগে পাঠোত্তর আমার উপলব্দি হচ্ছে, এ-লেখার মূল জায়গাটা প্রেমের পবিত্রতা কিংবা অপবিত্রতার সাথে সংশ্লিষ্টতার নয়, মৌলিক প্রশ্নটা আসলে ‘রিপ্রেজেন্টেশনের’ ।বাঙ্গালির হাতে পাহাড়ির-রিপ্রেজেন্টেশন । টেক্সটের ভেতর দিয়ে কোন বিষয় কিংবা প্রত্যয়-প্রপঞ্চ প্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে ‘রিপ্রেজেন্টেশনের’ যে রাজনীতি, এবং এ-রাজনীতি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকায়ণ প্রক্রিয়ায় প্রণোদনা দেয়, সমকালীন চিন্তার জগতে তা বহুল আলোচিত একটি বিষয় । আমি এখানে এ-উপসম্পাদকীয়টির টেক্সট বিশ্লেষণের মাধ্যমে পার্বত্যচট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিয়ে ‘রিপ্রেজেন্টেশনে’র যে রাজনীতি, এবং এর যে বৌদ্ধিক ও মনস্তাত্ত্বিক গড়ন, বাংলাদেশে বহুল চর্চিত একটি প্রবণতার পরিণত হয়েছে, সে বিষয়টি নিয়ে দু’য়েক কথা বলবার চাই । লেখা বাহুল্য, এ লেখার মূল লক্ষ্য কেবল উপসম্পাদকীয় নয় কিংবা এর লেখক নন; বরং আমার আলোচনার মূল নিশানা পাহাড়ি রিপ্রেজেন্টেশন বাঙ্গালি প্বণতা এবং এ প্রবণতার অন্তর্নিহিত রাজনীতি ।
লেখাটির দ্বিতীয় বাক্যটা এরকম, ‘[শৈল]....প্রপাতের কাছাকাছি যেতেই এক ঝিরিতে দেখা গেল কয়েকজন আদিবাসী নারীর অনেকটা বিবস্ত্র হয়ে গোসলের দৃশ্য’ । আমরা সকলেই কমবেশি জানি, সকলে না হলেও অধিকাংশ মানুষের গোসল করবার পোশাক হচ্ছে ‘বিবস্ত্রতা’ । কিন্তু আদিবাসী নারিদের ‘বিবস্ত্র’ উপস্থাপন করবার মধ্যদিয়ে একধরনের ‘নগ্নতা’ আস্বাদনের আনন্দ পাওয়া যায় । আর নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সভ্য, সভ্য, সুখ পাওয়া যায় । ভোক্তাদের, মানে পাঠকদের, কাছে এক ধরনের ইরোটিকতার স্বাদ প্রদান করা যায় । এ-’বিবস্ত্র আদিবাসী নারী’ মূলতঃ একটি উপাত্ত, একটি ইমেজ, যা ঐতিহাসিকভাবে পাহাড়ি-বাঙালী কিংবা সমতল-পাহাড়ের সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে । পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক-গবেষক হিসাবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত, জনাব ভ্যান শ্যানডেল লিখেছেন, ‘পাহাড়িদের সুন্দর-স্বাভাবিক জীবন-পদ্ধতি, বাঙ্গালীদের চোখে সর্বদা নগ্নতা হিসাবে হাজির হয় । বাঙ্গালীর এ-দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহাসিকভাবে পাহাড়িদেরকে অসভ্য হিসাবে উপস্থাপনে একটি রাজনৈতিক উপাত্ত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, (দেখতে পারেন, Wiliam V. Schendel, "Politics of Nudity: Photographs of the Naked Mru of Bangladesh". Modern Asian Studies, 36[2], 2002 )। ‘নগ্নতার রাজনীতি’ উপলব্দি করবার ভেতর দিয়েই আমরা রিপ্রেজেন্টেশনের রাজনীতির একটি চেহারা পেয়ে যায় । ‘প্রেম যেখানে অপবিত্র’-লেখার মূল স্পিরিট-টা আমাদেরকে সেই ইঙ্গিতই দেয় ।
লেখাটির তৃতীয় বাক্য হচ্ছে এরকম, ‘... যাত্রার সঙ্গী আরেক আদিবাসী সাবধান করে দিলেন, ওদের দিকে তাকানো যাবে না। ছবি তোলারও চেষ্টা েো না । তাহলে বিপদ হতে পারে । ঢাকা থেকে গিয়ে এ রকম অনেকে বিপদে পড়েছেন ।’ পাহাড়ীরা হিংস্র কিংবা ‘জংলী’ - এধরনের একটা ইমেজ পরিবেশনের এটি একটি অতি চর্চিত তরিকা । ‘ঢাকার নাগরিক কোলাহলের বাইরে পাহাড়ি আদিবাসী নারীদের নগ্নতার স্বাদ আর ছবি তুলে সে স্বাদ দীর্ঘায়িত করবার চেষ্টা’ - পুরো বিষয়টিই একটি নেতিবাচক ইমেজে নির্মাণ করা । বিতর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই এবং একটা অনুমান করি, এ মানুষগুলোর বিবস্ত্র ছবি তুললে, কি বিপদ হতে পারতো ? পাঠক, এবার নিজের কাছে প্রশ্ন করুন, কেউ যদি আপনার বিবস্ত্র ছবি তুলে/তুলতো তাহলে আপনি কী করবেন বা করতেন ? আপনি যা করতেন, এ পাহাড়ি মানুষগুলো কি এর চেয়ে বেশি কিছু করতো ? এখানেও মূল প্রশ্নটা ‘রিপ্রেজেন্টেশনের’ । পাহাড়ি সহজ-স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষগুলোকে একধরনের ‘বিপদজনক প্রাণী’ হিসাবে নির্মাণের রাজনীতি । এ ধারাবাহিকতার, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মনে পাহাড়িদের সম্পর্কে একটা ‘হিংস্র’ কিংবা ’জংলী’ ‘জংলী’ ইমজে তৈরি হয়েছে, যা মূলতঃ পাহাড়ি নিয়ে বাঙ্গালী তথাকথিত বিদ্যায়তনিক-পন্ডিতদের শাস্ত্রীয় জ্ঞান-উৎপাদন এবং ভাড়াটে কনসাল্টেন্ট ও উন্নয়ন-ব্যবসায়ীদের রিপোর্ট-উৎপাদনের সুদূরপ্রসারী প্রতিফল । একবিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের বৌদ্ধিক এবং নৈতিক বিকাশের সমকালে বসবাস করেও, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা নিয়ে স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রায় বিলীনময় অস্তিত্ব-সম্পন্ন পাহাড়ি-জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের এখনো রয়ে গেছে সামন্তবাদী-চিন্তা, মনস্তাত্ত্বিক গোঁয়ারতুমি এবং মেজরিটি হবার বেয়াড়া দেমাগ । তাই, প্রশ্ন জাগে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ’অসভ্য’ হিসাবে উপস্থাপনের এ নগ্ন রাজনীতি কিংবা এ অসুস্থ বৌদ্ধিক ও মনস্তাত্ত্বিক গড়ন নিয়ে আমরা নিজেরা আসলে কতোটা সভ্য ?
প্রেম এবং অপবিত্রতার বিশ্লেষণে আসা যাক । লেখক লিখেছেন, তবে বিয়ের ক্ষেত্রে বমদের রয়েছে বিশেষ নিয়ম । তাদের দ’রকমের বিয়ের নিয়ম আছে । একটি দান থেনত লিপ অর্থাৎ পবিত্র বিয়ে । আরেকটি দান থেনত লিপ লৌ মি, অপবিত্র বিয়ে । প্রেমের সম্পর্কের বিয়েকে এরা অপবিত্র বলে ধরে থাকে....। এখানেও মূল প্রশ্নটা বিয়ে বা প্রেমেরে ধরণ কিংবা এর পবিত্রতা বা অপবিত্রতার নয়, মৌলিক সংশ্লিষ্টতা ‘রিপ্রেজেন্টেশনের’ । পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর বিয়ে, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা-ভেদে কিছু গুণগত পার্থক্য থাকলেও, মোদা দাগে এক অর্থে দুই ধরনেরই । বাঙালীদের বিয়ে ধরনও দুই রকম । বাবা মার পছন্দে বিয়ে এবং পালিয়ে বিয়ে । ইংরেজিতে বলা হয়, সেটেলড-ম্যারেজ এবং এ্যাফার্ড-ম্যারেজ । তাহলে বম-জাতির বিয়েতে ভিন্নতা কোথায়? পবিত্র বা অপবিত্রতার প্রশ্নটি যদি প্রকৃতই ভিন্নতার কারণ হয়, তাহলে সেখানে আছে ‘ভিন্নতার রাজনীতি’ । স্বনামধন্য নৃবিজ্ঞানী ফিলিপ বার্নহাম বলেছেন, ‘মানুষ নিজের শৌর্য-বিরয প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য, অন্যকে েএকটু ভিন্নভাবেউপস্থাপন করে, যেখানে অন্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সত্ত্বাকে নিম্নতর হিসাবে উপস্থাপন করা হ ‘ ( । যদি যুক্তির খাতির ধরেই নিই বমরাই এ-দুই বিয়ের পদ্ধতিকে ‘পবিত্র’ এবং ‘অপবিত্র’ বলে থাকে । সেখানেও আমরা দেখতে পাই, একধরনের সাংস্কৃতিক স্বাজাত্যবোধের অচেতন প্রতিফলন । যেমন, লেখক দাবি করেছেন বম ভাষায় ‘দান থেনত লিপ’ মানে ‘পবিত্র’ বিয়ে আর ’দান থেনত লিপ লৌ মি’ মানে ‘অপবিত্র’ বিয়ে । কিন্তু প্রকৃতার্খে বম ভাষায় ‘দান থেনত লিপ’ এর বাংলা সারার্থ, আক্ষরিক শব্দার্থ নয়, হচ্ছে মুরুব্বিদের আশীর্বাদ নেয়া বিয়ে বা এর কাছাকাছি কোন অর্থ । আর অন্যটা হচ্ছে, মানে ‘দান থেনত লিপ লৌ মি’ -এর বাংলা সারার্থ হচ্ছে যেখানে মুরুব্বিদের অমতে বিয়ের কারণে আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ইত্যাদি ।এটাকে ‘পবিত্র’ কিংবা ‘অপবিত্র’ তার শাব্দিক ডাইকোটমিনিয়ে প্রকৃতার্থে উপলদ্ধি সম্ভব নয় । বম ভাষার শক্তি হচ্ছে, সেখানে একটি শব্দ অনেক কিছুকে অর্থপূর্ণ করে, যা কিছু চোখ-মধুর এবং কান-মধুর বাংলা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না । যেটা যায়, সেটা হচ্ছে ‘রিপ্রেজেন্টেশন’, যা বম জাতির বিয়ের ধরণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ‘পবিত্র-অপবিত্রতার’ ডিসকোর্সের ভেতর দিয়ে একটি নেতিবাচক ইমেজের জন্ম দেয় ।
পরিশেষে বলতে চাই, পাহাড়ি বনাম বাঙ্গালী, প্রান্তিক-পাহাড়ি বনাম পাহাড়ি-এলিট এবং পাহাড়ি বনাম রাষ্ট্রের সম্পর্কের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতির এথনো-ঐতিহাসিক বিকাশ, ধরণ, নির্মিতি এবং সমকালীন এনটিটি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করবার প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এবং দুর্গম এলাকায় সম্প্রতি আমি প্রায় দেড়-বছর বসবাস করেছি । আমার পাহাড়িদের সাথে যাপিত-জীবনের অভিজ্ঞতায় বাঙ্গালি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভূ-রাজনৈতিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় পাহাড়ি বনাম বাঙ্গালি সম্পর্কের ইতিহাস ও এর বিবর্তনে বাঙ্গালির যে অবস্থান ও ভূমিকা, তা আমাকে যারপরনাই লজ্জিত করে । ভাষার দাবিতে যে জনগোষ্ঠী প্রাণ দিতে পারে; সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য যে মানুষ জীবন দিতে পারে, সে মানুষ বা জনগোষ্ঠী অন্য জাতির বা ভিন্নজাতিসত্ত্বার মানুষকে কীভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শোষণ ও দমন করতে পারে কিংবা তাদের উপর অন্যান্য অধিপত্য বিস্তার করতে পারে, এটা একটি বিরাট জিজ্ঞাসা । লেখককে ধন্যবাদ এজন্য যে, তিনি তার লেখার মাধ্যমে পাহাড়ি রিপ্রেজেন্টেশনে বাঙ্গালি প্রবণতা অবগুন্ঠিত করবার মধ্যদিয়ে আমাদের সকলকে আরো একবার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করানো মওকা দিয়েছেন । পরিশেষে বলবো, রিপ্রেজেন্টেশনের রাজনীতির আধিপত্যবাদি-প্রার্সপেক্টিভ থেকে যতদ্রুত বিযুক্ত ততেই সকলের মঙ্গল । ‘পাহাড়’ ও ‘পাহাড়ি’-র তো বটেই ।।
লেখক: ড. রাহমান নাসির উদ্দিন; লেখক ও গবেষক । সহযোগী অধ্যাপক- নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, চ. বি ।।


কোন মন্তব্য নেই:
Jhu Jhu
Welcome to my blog. I know how much my blog will help you. Can not help as you like? Let me know your choice in the comments to get your choice. I will try to give your favorite poems and books. Thank you for coming to my blog, come back .